
নিউইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানির জয় শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, কয়েক হাজার মাইল দূরের ভারতেও ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। গুজরাটি বংশোদ্ভূত এই ভারতীয়–আমেরিকান নেতা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী শহরের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যমে উচ্ছ্বাস ও সমালোচনা দুই-ই চলছে।
মুম্বাই ও দিল্লি পর্যন্ত আলোড়ন ছড়িয়েছে এই সংবাদে। তবে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ জোহরান মামদানি মুসলিম পরিচয়ের অধিকারী, এবং তিনি ভারতের শাসক দল বিজেপির কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট বিজয় ভাষণে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন,
“ইতিহাসে খুব কম সময় এমন আসে, যখন আমরা পুরোনো থেকে নতুনের দিকে এগিয়ে যাই… আজ রাতে নিউইয়র্ক সেটাই করেছে।”
ভাষণ শেষে তিনি তাঁর স্ত্রী সিরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক রমা দুওয়াজিকে মঞ্চে ডাকেন। সেই সময় আবহ সংগীতে বাজে বলিউডের জনপ্রিয় গান “ধুম মাচালে”। পরে মঞ্চে যোগ দেন তাঁর মা, চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার, এবং বাবা মাহমুদ মামদানি।
জোহরান মামদানি তাঁর ভারতীয় পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ করেন এবং প্রায়ই প্রচারে ভারতীয় পোশাক পরেন। কিন্তু তাঁর বিজয়ের পর বিজেপির অনেক নেতা নীরব থাকলেও, কেউ কেউ মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন।
মুম্বাইয়ের বিজেপি প্রধান অমিত সাতম বলেন,
“কিছু আন্তর্জাতিক শহরের রং পরিবর্তিত হচ্ছে… যদি কেউ মুম্বাইতে খান বসাতে চান, তা সহ্য করা হবে না!”
এ বক্তব্য মুসলিমদের প্রতি ইঙ্গিতবাহী বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
এর আগে বিজেপির সংসদ সদস্য রেখা শর্মা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী ভারতীয়দের জোহরানের বিরুদ্ধে ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ভারতের বহু মুসলিম নাগরিক জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক জয় উদ্যাপন করছেন। লেখক ও সাংবাদিক রানা আইয়ুব বলেন,
“জোহরানের বিজয় ভারতের সামনে একটি আয়না—যেখানে হারানো প্রতিশ্রুতি ও অবশিষ্ট সম্ভাবনা প্রতিফলিত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,
“বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতে আজ সংসদে একজন মুসলিম প্রতিনিধিও নেই। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে একজন ভারতীয় মুসলিম নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।”
জোহরান মামদানি গুজরাটি বংশোদ্ভূত—যে রাজ্যে ২০০২ সালে ভয়াবহ মুসলিম দমনপীড়ন ঘটেছিল। সেই সময় নরেন্দ্র মোদি ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।
জোহরান একাধিকবার মোদির সমালোচনা করে বলেছেন,
“মোদি গুজরাটে মুসলিমদের গণহত্যা সংঘটনে সহায়তা করেছিলেন… তিনি একজন যুদ্ধাপরাধী, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো।”
এর জবাবে বিজেপির মুখপাত্র সঞ্জু ভার্মা তাঁকে ‘হিন্দুবিদ্বেষী ও মিথ্যাবাদী’ আখ্যা দেন। এমনকি অভিনেত্রী–এমপি কঙ্গনা রানাউত পর্যন্ত মন্তব্য করেন, “জোহরান ভারতীয়ের চেয়ে পাকিস্তানি বেশি মনে হয়।”
অন্যদিকে, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও লেখক শশী থারুর জোহরান মামদানিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রিয়াঙ্কা বলেন,
“নেহরুর দেশেই এখন তাঁকে অপমান করা হয়, অথচ জোহরান তাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে জয় ঘোষণা করলেন—এটা গর্বের।”
কমেডিয়ান কুণাল কামরা মন্তব্য করেছেন,
“জোহরান মামদানি ভারতকে আদানি ও আম্বানির চেয়ে বেশি গর্বিত করছেন।”
জোহরান মামদানির এই বিজয় শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়—এটি ভারতের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক।
যেখানে ভারতীয় মুসলিমরা নিজেদের দেশে বৈষম্যের মুখে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁদের একজন সন্তান বিশ্বের সবচেয়ে বড় শহরের নেতৃত্বে পৌঁছেছেন।